এবনে গোলাম সামাদ – ইমরুল হাসান

agsamad.com
নিজের সংগ্রহের সাথে এবনে গোলাম সামাদ
এবনে গোলাম সামাদের (১৯২৯ – ২০২১) “আত্মদর্শন” লেখা’টা ছাপা হইছে উনার “বাংলাদেশের আদিবাসী এবং জাতি ও উপজাতি” (পরিলেখ, ২০১৩) বইয়ের ১১০-১১৬ পেইজে।
এই লেখাটা অটোবায়োগ্রাফিক্যাল একটা জিনিস, কিন্তু বইটা তা না। বইয়ের একটা ব্যাকগ্রাউন্ড হিসাবে এই লেখাটা উনি বইয়ে রাখছেন, যাতে রাইটার সম্পর্কে রিডার’রা একটা ধারণা পাইতে পারেন।
বইটা হইতেছে মেইনলি বাংলাদেশের পাবর্ত্য চট্টগ্রাম সমস্যা নিয়া; অইটা বলতে গিয়া জাতি-উপজাতির ধারণা এবং অন্য সব আলাপ আসছে। উনার এনালাইসিসগুলা ইন্টারেস্টিং। এটলিস্ট তিনটা জায়গা তো খেয়াল করতে পারবেনই।
এক, হিস্ট্রিক্যাল ফ্যাক্টগুলা; যেইটা হিল-ট্রাকস নিয়া পপুলার আলাপগুলাতে মিসিং। যেমন ধরেন, একটা সময়ে চাকমা রাজাদের দুইটা নাম থাকতো, এর মধ্যে একটা নামে ‘খাঁ’ থাকতো, কারণ মুসলিম শাসকের হেল্প নিয়া চাকমা রাজা আরাকানের রাজারে যুদ্ধে হারাইছিলেন, যার ফলে একটা ভালো সম্পর্ক ছিল; পরে ব্রিটিশ পিরিয়ডে চাকমারা লক্ষীপূজা শুরু করেন; আর বাংলাদেশ পিরিয়ডে খ্রিস্টান মিশনারি’রা অই এলাকাতে এক্টিভলি কাজ করতেছেন চাকমাদের বাইরে ছোট ছোট উপজাতিদেরকে খ্রিস্টান ধর্মে কনভার্ট করতেছেন। এইটারে কন্সপিরেসি থিওরির জায়গা থিকা না দেইখা, ধর্ম যে একটা জরুরি জাতি-উপাদান সেইটারে মার্ক করাটা তো দরকার।
দুই হইতেছে, বৌদ্ধধর্ম এবং ইসলাম ধর্মের একটা সম্ভাব্য কানেকশন থাকার কথা উনি অনুমান করছেন। ইসলামের যেইরকম অনেকগুলা তরিকা আছে, বৌদ্ধধর্মেরও অনেক প্যাটার্ন তৈরি হইছিল, যার একটা ধরণ সিরিয়া পর্যন্ত গেছিল, সেইখান থিকা এর ইমপ্যাক্ট আরব পর্যন্ত পৌঁছানোর কথা। অন্যদিকে বাংলাদেশে যখন ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাইছে তখন একটা ক্যাটাগরির বৌদ্ধরাই ইসলামে কনভার্ট হইছেন। যেমন হইছে, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াতে; মানে, এইগুলারে ‘ফ্যাক্ট’ বা ‘সত্যি’ হিসাবে নেয়ার বাইরে কানেকশনগুলারে যাচাই করতে পারাটা দরকার আমাদের।
তিন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলন যে বিপ্লবের নামে সবসময় ‘জন-বিচ্ছন্ন’ একটা জিনিস, এই ক্রিটিক উনার মতো আর কেউ মেবি এতো ভালোভাবে করতে পারেন নাই। তেভাগা আন্দোলনরে যে উনি ‘ইলা মিত্র ও তাঁর জামাইয়ের আন্দোলন’ বলছেন, সেইটা ‘ঠিক’ না হইলেও সমাজের বড় অংশের মানুশের লগে যে রিলেশন তৈরি করতে পারে নাই, সেইটা ‘সত্যি’ ঘটনাই অনেকটা; বা ব্রিটিশ আমলের সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবী আন্দোলনরে যে ‘হিন্দু-জাগরণের’ ঘটনা বলছেন, সেইটা পুরাপুরি ‘সত্যি’ না হইলেও ‘ভুল’ কথাও না। মানে, কমিউনিস্ট আন্দোলনগুলারে যে রোমান্টিসাইজ করার জায়গাগুলা আছে, সেইখানে উনি বেশ ব্রুটাল হইতে পারছেন। এইটা পজিটিভ, এক হিসাবে।
কিন্তু তারপরও দেখবেন, উনার যেই সাজেশন বা ডিসিশান সেইগুলারে নেয়া যায় না। যেমন, পাবর্ত্য চট্টগ্রাম থিকা মিলিটারি উইথড্র করা ঠিক না, সমতলরে বাঙালিদেরকে হিল ট্রাকসে জমি কেনার পারমিশন দিতে হবে, ‘বাঙালিরাই হইতেছে আদিবাসী’… এইরকম জায়গাগুলা। এইগুলা খালি ভুল-ই না বরং জুলুমের-অপ্রেশনের হাতিয়ারও হয়া উঠতে পারে।
আর এইগুলারে আসলে উনার ভুল হিসাবে দেখলেও ‘ভুল’ হবে, বরং উনি যেই পজিশনটাতে আছেন, সেইখান থিকা এইরকম সাজেশনগুলাই আসার কথা। উনার পলিটিক্যাল পজিশনটা কি? যদিও ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের’ কথা উনি বলছেন, কিন্তু উনার পজিশনটারে বেটার বুঝা যাইতে পারে ‘বাঙালি মুসলমান জাতীয়তাবাদের’ জায়গা থিকা। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’রে যদি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জায়গা থিকা দেখেন, তাইলে কিন্তু বাঙালি এবং মুসলমান, এই দুইটা আইডেন্টিটির উপরে আটকায়া থাকতে হয় না, তখন হিন্দু, সাঁওতাল, চাকমা, মারমা, এইরকম আলাদা করতে হয় না, বহুজাতির জায়গা থিকাই দেখতে পারা যাইতো। কিন্তু আহমদ ছফা ও সলিমুল্লাহ খানদের মতো এবনে গোলাম সামাদও বাঙালি আইডেন্টিটির লগে মুসলিম আইডেন্টিটিরেই অ্যাড করতে চান শুধু। এইটা উনার কোর পজিশন।
সেকেন্ড জিনিস হইতেছে, উনি প্রাকটিক্যালির উপর নজর দিতে চাইলেও একটা সংজ্ঞা বা ডেফিনেশনের উপরেই ভরসা রাখতে চান, আর সেইটা খালি ‘কেতাবি’-ই না, অনেকটা ‘ব্যাকডেটেড’ ঘটনাও।
যেমন ধরেন, যেইভাবে উনি বাংলা-ভাষী লোকজনরে ‘আদিবাসী’ প্রমাণ করার জন্য মরিয়া হয়া উঠছেন, সেইখানে উনি যেই সংজ্ঞা’রে নিতেছেন, সেইটা পুরানা আমলের ল্যান্ডের সাথে জড়িত একটা জিনিস; কিন্তু এখন একাডেমিয়াতেও ‘আদিবাসী’ বলতে অই জনগোষ্ঠীরে বুঝানো হয় না, যারা ‘প্রাচীন বা আদিম মানুশ’, বরং এমন একটা জনগোষ্ঠী বা কালচার, যারা ‘বিলীন’ হয়া যাইতেছে, যাদেরকে প্রটেক্ট করা দরকার। এবনে গোলাম সামাদ বলতেছেন, এদেরকে তো বিলীন হইতেই হবে; এইরকমই তো হয়া আসছে, এইরকমই তো হবে! তো, এইরকম আনফরচুনেট ডিসিশান নেয়ার জায়গাটাতেও উনি নিজেরে সন্দেহ করতে পারতেছেন না! এইটা মোটামুটি ভয়াবহ একটা জিনিস। বাঙালি হওয়ার নামে যেইরকম জুলুমরে আপনি সার্পোট করতে পারেন না, ইসলাম কায়েম করার নামে বা ‘প্রগতিশীল’ হওয়ার নামেও একইরকমের জুলুমরে সার্পোট করা যায় না। এইটা খালি আইডিওলজিক্যাল আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের ঘটনা না, বরং যে কোন আইডিওলজিরেই জুলুমের হাতিয়ার হিসাবে ম্যান্ডেট না দিতে চাওয়ার ঘটনা। এই জায়গাটাতে এবনে গোলাম সামাদরে নেয়াটা ঠিক হবে না।
থার্ড বা ক্রুশিয়াল জায়গাটা হইতেছে, এই কারণে উনার আর্গুমেন্টগুলারে উনি আসলে মিলাইতেও পারেন নাই। বেশিরভাগ সময়ই বিচ্ছিন্ন এবং এমনকি ইরিলিভেন্টও মনে হইতে পারে যে, কেন বলতেছেন উনি এই কথা, এর রিলিভেন্সটা কি, এইরকম। মানে, এইটারে বেশি-বয়সের মানুশের কথা-বলার সমস্যা বা একসাইটিং ইনফরমেশনের বাইরেও রিলিভেন্স ক্রিয়েট না করতে পারার সমস্যা হিসাবেও নিতে পারাটা দরকার।…
তো, আমাদের ধারণা, বাংলাদেশের এখনকার পপুলার ন্যারেটিভগুলার ব্যর্থতার জায়গা থিকা এবনে গোলাম সামাদের চিন্তাগুলা রিলিভেন্ট হয়া উঠার সম্ভাবনার মধ্যে আছে, যদি এখনো রিলিভেন্ট না হয়া উঠতে পারে; সেইখানে একটা বাছবিচারের মধ্যে দিয়াই আমাদেরকে যাইতে হবে, যেইটা উনারে নেয়া বা না-নেয়ার চাইতেও জরুরি একটা ঘটনা হিসাব মার্ক করে রাখতে চাইতেছি।
-ইমরুল হাসান, লেখক
২০২১, ফেসবুক পোস্ট থেকে নেয়া।

Like this article?

Leave a comment

জনপ্রিয় লেখাসমূহ

জনপ্রিয় বিভাগসমূহ