‘শিল্পকলার বিচার বিশ্লেষণ’ – ড. আব্দুস সাত্তার

Photo: ISLAMIC ARTS MUSEUM MALAYSIA

নয়া দিগন্ত পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতায় প্রবীণ লেখক এবনে গোলাম সামাদ ‘আমাদের চিত্রকলা’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেই প্রবন্ধ পড়ে আমিও ‘এবনে গোলাম সামাদের দৃষ্টিতে আমাদের চিত্রকলা’ নামে প্রবন্ধ লিখেছিলাম। প্রবন্ধটি নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ২১ অক্টোবর প্রকাশ করার পর এবনে গোলাম সামাদ ২৯ অক্টোবর বেশ কিছু মন্তব্য করে আরেকটি প্রবন্ধ লিখেছেন। এবার শিরোনাম ‘শিল্পকলার বিচার-বিশ্লেষণ’।

জনাব এবনে গোলাম সামাদ তার প্রবন্ধ যেখানে শেষ করেছেন সেখান থেকে শুরু করছি। কারণ আগের প্রবন্ধও এখান থেকেই শুরু করেছিলাম। শুরুতে লিখেছি- ‘জনাব এবনে গোলাম সামাদকে প্রধানত রাজনৈতিক বিষয়ের কলাম লেখক হিসেবেই জানি। ৩০ জুলাই নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ‘আমাদের চিত্রকলা’ বিষয়ে কলাম লিখেছেন তিনি। ইতঃপূর্বে চিত্রকলা বিষয়ে তার কোনো লেখা পড়েছি বলে মনে পড়ে না।’ কথাগুলো লেখার কারণ হলো, সাধারণত শিল্পকলা বিষয়ে সবাই সাহিত্য বা শিল্পসংস্কৃতিবিষয়ক পাতায় লিখে থাকেন। কিন্তু লেখক লিখেছেন সম্পাদকীয় পাতায়। যে পাতায় এর আগে তার আর কোনো লেখা পড়িনি। অপর দিকে এবনে গোলাম সামাদ তার দ্বিতীয় প্রবন্ধের শেষ কলামে লিখেছেন, ‘… ড. আব্দুস সাত্তার (২১ অক্টোবর ২০১৬) তার লিখিত এবনে গোলাম সামাদের দৃষ্টিতে আমাদের চিত্রকলা নামক প্রবন্ধে বলেছেন, আমি রাজনীতিতে কলাম লিখি। সেটাতেই আমাকে মানায়। শিল্পকলা নিয়ে আলোচনা আমার জন্য অসঙ্গত।’

আমি কী বলেছি, সে কথা এই প্রবন্ধের শুরুতেই উল্লেখ করেছি। সুতরাং আমার বক্তব্যের সাথে লেখকের অভিযোগের সম্পর্ক আছে বলে মনে করি না, বরং লেখকের প্রশংসা করে আমার প্রবন্ধে বলেছি, ‘চিত্রকলা বিষয়ের গভীরে প্রবেশ, সত্যান্বেষণ এবং সত্য প্রকাশে লেখকের স্বতঃস্ফূর্ততা বিস্ময়ের কারণ। আমাদের দেশে যারা শিল্পকলা বিষয়ে নিজেকে পণ্ডিত মনে করেন এবং লিখে থাকেন, তাদের লেখায় এসব লক্ষ করা যায় না। এবনে গোলাম সামাদ ক্ষুদ্র পরিসরে আমাদের চিত্রকলা বিষয়ে যে অভিমতগুলো তুলে ধরেছেন, সেগুলো পড়ে আমার মনে হয়েছে, চিত্রকলা তথা শিল্পকলা বিষয়ে তিনি গভীর জ্ঞানের অধিকারী।’ আমি জানি, শিল্পকলা বিষয়ে শেষ কথা বলে কিছু নেই। কারণ একই বিষয় নিয়ে একেক পণ্ডিত একেক কথা বলেছেন। তা ছাড়া শিল্পকলা বিষয়ে আমার যে ক্ষুদ্র জ্ঞান, সেই জ্ঞানের ওপর নির্ভর করে এবনে গোলাম সামাদের মতো জ্ঞানী মানুষকে ‘শিল্পকলা নিয়ে আলোচনা তার জন্য অসঙ্গত’ বলা ধৃষ্টতার শামিল। এমন কথা আমার প্রবন্ধে নেইও।

এবনে গোলাম সামাদ তার প্রবন্ধের আরেক স্থানে লিখেছেন, ‘ড. আব্দুস সাত্তার ইসলাম সম্পর্কে কতটা অবগত, আমি জানি না। তিনি অযথা ইসলামের কথা টেনে এনেছেন।’ তার এ বক্তব্য সম্পর্কে সবিনয়ে বলতে চাই, আমি অযথা ইসলামের কথা টেনে আনিনি। এবনে গোলাম সামাদ তার প্রথম প্রবন্ধে (৩০ জুলাই ২০১৬) শিল্পকলা বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ধর্মের কথা এনেছেন। এটা শিল্পী হিসেবে আমার কাছে যৌক্তিক এবং আমার চিত্রচর্চার জন্য সহায়ক মনে হয়েছে। সে জন্যই লেখকের আলোচিত কিছু বিষয়ের কথা আমার প্রবন্ধে উল্লেখ করেছি, যাতে আরো অনেকে বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত হতে পারেন। এ বিষয়ে আলোচনায় দোষের কিছু দেখি না, বরং খুশি হয়েছি, লেখক আমার ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে আরো কিছু নতুন ধর্মীয় তথ্য তুলে ধরেছেন। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরো তথ্য পেলে খুশি হবো।

শিল্পকলার কোনো বিষয় নিয়েই শেষ কথা বলা যায় না। আবার কোনো বিষয়ে সবাই একই কথা বলবেন- সেটাও আশা করা যায় না। এবনে গোলাম সামাদ লিখেছেন- ‘জয়নুল আবেদিন দুর্ভিক্ষের ছবি এঁকেছেন, কিন্তু তা আমাদের মনে করুণ রসের সঞ্চার করে না অথবা উদ্বুদ্ধ করে না দুর্ভিক্ষ রোধের জন্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগী হতে। অন্য দিকে চিত্রকলার টেকনিকের দিক থেকে এগুলোকে বলা যায় ওয়াশড্রইং। সাধারণত ওয়াশড্রইংকে উন্নতমানের চিত্রকলা বলে মনে করা হয় না।’

‘জয়নুলের দুর্ভিক্ষের ছবি আমাদের মনে করুণ রসের সঞ্চার করে না’ এবং ‘দুর্ভিক্ষের ছবিকে বলা হয় ওয়াশড্রইং, যাকে উন্নতমানের চিত্রকলা বলে মনে করা হয় না’- এ দুটো বিষয়ের অর্থ হৃদয়ঙ্গম করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছি। লেখকের উল্লিখিত ১০টি আবেগের মধ্যে করুণ, ভয়ানক ও বীভৎস ‘রসা’ কি জয়নুলের দুর্ভিক্ষের চিত্রে প্রকাশ পায়নি? হাড্ডিসার মৃত মায়ের দুধপানরত শিশু, কাক, কুকুরের সাথে ডাস্টবিনে ময়লার মধ্যে মানুষের খাদ্যান্বেষণ কিংবা শীর্ণকায় সন্তান সাথে নিয়ে পাত্র হাতে ভিক্ষার জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়া, এরূপ অসংখ্য চিত্র কি রসের কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না আমাদের হৃদয়ে? নিশ্চয়ই করে। তাহলে এগুলোকে সফল সৃষ্টি বলা হবে না কেন?

তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের ছবি শিল্পী ইন্দ্র দুগার, চিত্তপ্রসাদ এবং সোমনাথ হোড়ও এঁকেছেন। তবে সেসব চিত্রের বা ছবির সংখ্যা উল্লেখ করার মতো নয়। এদের সেসব ছবি নিয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসাও করা হয়নি, যতটা জয়নুলের ছবির বিষয়ে করা হয়েছে। কলকাতার পণ্ডিত অর্ধেন্দ্রকুমার গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন- ‘জয়নুলের দুঃসাহসী নিষ্করুণ তুলির আঁচড়ে এমন এক স্বতঃস্ফূর্ততা, আন্তরিকতা ও বাস্তবধর্মিতা ফুটে উঠেছে, যা বাংলার আধুনিক শিল্পীদের মধ্যে দুর্লভ’ (অশোক ভট্টাচার্য, বাংলার চিত্রকলা, কলকাতা)। এরিক নিউটন বলেছেন- ‘…এগুলোতে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের এমন এক সমন্বয় দেখা যায়, যা সকলেই মনে করেছেন অসাধ্য’ (প্রাগুক্ত)। তবে জনাব এবনে গোলাম সামাদ একমত পোষণ নাও করতে পারেন।’

‘ওয়াশড্রইং’ শব্দটির অর্থ বুঝতে পারিনি। বাংলা ও ইংরেজি অভিধানেও খুঁজে পাইনি। তবে ওয়াশ পেইন্টিং সম্পর্কে কিছুটা হলেও বুঝি। বিখ্যাত শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাপানি শিল্পীর কাছে জল-রং চিত্রে কিভাবে ওয়াশ দিতে হয় বা জলরঙ চিত্র কিভাবে ধুয়ে ধুয়ে করতে হয়, সে বিষয়ে শিখে ভারতীয় শিল্পে ওয়াশ পদ্ধতি চালু করেছিলেন। প্রাচ্যকলার ক্ষেত্রে ওয়াশ পদ্ধতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই পদ্ধতিতে চিত্রে ব্যবহৃত রঙে যে রহস্যময়তা সৃষ্টি, যে মিষ্টতা আনয়ন এবং যে হৃদয়গ্রাহী রূপের রহস্য সৃষ্টি করা যায়, অন্যভাবে তা করা যায় না। বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী আব্দুর রহমান চুঘতাই এই ওয়াশ পদ্ধতিতে অসংখ্য চিত্র এঁকে খ্যাতি অর্জন করেছেন। তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা মাস্টার পেইন্টার হিসেবে স্বীকৃত।

এবনে গোলাম সামাদ, বলেছেন- ‘বাংলাদেশে ছবি আঁকা হচ্ছে পাশ্চাত্য ধারায়।’ এ বক্তব্য শতভাগ বাস্তবভিত্তিক নয়। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে ‘প্রাচ্যকলা বিভাগ’ নামে স্বতন্ত্র বিভাগ আছে। এ বিভাগ দুটোতে প্রাচ্য ধারায় শিক্ষা দেয়া হয়। বাংলাদেশে প্রাচ্য ধারার চিত্রচর্চা এবং প্রদর্শনীর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জয়নুল আর্ট গ্যালারিতে বাংলাদেশের ও ভারতের প্রাচ্য ধারার নবীন ও খ্যাতিমান প্রবীণ শিল্পীদের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। নয়া দিগন্ত পত্রিকাতেই এই গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শনীর ওপর প্রবন্ধ লিখেছি। আশা করছি, এবনে গোলাম সামাদকে এ বিষয়টি কিছুটা হলেও আশ্বস্ত করবে। কারণ তিনি বাংলাদেশের চিত্রে প্রাচ্য ধারার প্রভাব নেই বলে হতাশা ব্যক্ত করেছেন।

লিখেছেন ড. আব্দুস সাত্তার, প্রকাশিত নয়াদিগন্ত পত্রিকায়, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৬। 

Like this article?

Leave a comment

জনপ্রিয় লেখাসমূহ

জনপ্রিয় বিভাগসমূহ