হস্তি-চরিত

ctgpratidin.com

আমরা আমাদের এই আলোচনায় সাধারণভাবে হাতি বলতে বোঝাচ্ছি সেসব তৃণভোজি স্তন্যপায়ী প্রাণীদের, যাদের শুঁড় আছে ও উপরের মাড়ির দু’টি ছেদক দন্ত খুব লম্বা হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে, যাকে আমরা বলি হাতির দাঁত। জীবিত হাতিদের এখন দু’টি প্রজাতিতে ভাগ করা হয়। একটি প্রজাতিকে প্রাণীবিজ্ঞানে বলা হয় Elephas maximus বা এশীয় হাতি। আর অপর প্রজাতির হাতিকে বলা হয়, Loxodanta africana, আগে বলা হতো Elephas africanas । আমরা আমাদের দেশে যে হাতিকে দেখি, আফ্রিকার হাতি তার চেয়ে বড়।

আফ্রিকার হাতি সহজে পোষ মানতে চায় না। আমাদের হাতি সহজেই পোষ মানে এবং তার পিঠে চড়ে চলা যায় এবং ভার বহনের কাজে নিয়োজিত করা চলে। আমাদের হাতি ছায়া পছন্দ করে। সে বনে ছায়ার মধ্যে শুয়ে ঘুমায়। অন্য দিকে, আফ্রিকার হাতি খর রোদেও চলাফেরা করে এবং দাঁড়িয়ে ঘুমায়। আমাদের হাতির তুলনায় আফ্রিকার হাতির কান অনেক বড় এবং যাকে বলে হাতির দাঁত তা-ও অনেক বড় এবং ভারী। যেহেতু আমাদের হাতি সহজেই পোষ মানে, তাই তাদের অতীতে বিশেষভাবে লাগানো হয়েছে যুদ্ধের কাজে। আমাদের রাজা-বাদশাহরা যুদ্ধ করেছেন হাতিতে চড়ে। প্রাচীনকালে সেনাবাহিনী গঠিত হয়েছে চতুরঙ্গ দিয়ে। চতুরঙ্গ বলতে বুঝিয়েছে রণহস্তি, ঘোড়ায় টানা রথ, ঘোড়সওয়ার এবং পদাতিক সৈন্যকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে বার্মা ফ্রন্টে হাতি ব্যবহার করা হয়েছে রসদ ও গোলাবারুদ বহনের কাজে। তবে আগের মতো হাতি আর থাকেনি যুদ্ধের ব্যাপারে তেমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে। এ দেশে হাতি ব্যবহার হয়েছে প্রধানত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার জন্য।

বাংলাদেশে বনে প্রচুর বুনোহাতি পাওয়া যেত। এদের ধরে পোষ মানানো হতো। এরা হয়ে উঠত পোষা হাতি। ঢাকার কাছে ছিল ঘন শাল বন। যাকে বলা হতো মধুপুরের বন। এই বন ঢাকা থেকে উত্তরে টাঙ্গাইল পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ছিল। এই বনের পূর্বাংশকে বলা হতো ভাওয়ালের বন। এই সমগ্র বনেই ঘুরে বেড়াত বুনোহাতি। মধুপুর বনের মূল বৃক্ষ ছিল শাল। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, ১৯১৫ সালেও মধুপুর সাল বনে বুনোহাতি ধরা পড়েছে। ঢাকার একটি জায়গাকে বলে পিলখানা। ফারসি ভাষায় পিল মানে হলো হাতি। আর খানা মানে হলো স্থান। এখানে বুনোহাতিদের ধরে এনে পোষ মানানো হতো। তারপর তাদের বিক্রি করা হতো। হাতির দাঁত কেটে নিয়ে তা দিয়ে বানানো হতো সুন্দর নকশা করা কৌটা, মূর্তি ও মেয়েদের হাতের চুড়ি। ঢাকার হাতির দাঁতের কাজের নাম ছিল।

বাংলার উত্তারাঞ্চলে কোনো বন ছিল না। অনেক দিন আগে এখান থেকে বনভূমির বিলুপ্তি ঘটেছিল। গড়ে উঠেছিল জনপদ; কিন্তু রংপুর জেলার (এখনকার জেলা হলো কুড়িগ্রাম) দরওয়ানি ছিল একটা বিখ্যাত পাটের গঞ্জ। তার কাছেই ছিল এক পীরের মাজার। সেখানে প্রতি বছর পৌষ-মাঘ মাসে এক মাস স্থায়ী এক বিরাট মেলা বসত। এই মেলায় হাতি, ঘোড়া, উট, মহিষ, গরু, ভেড়া কিনতে পাওয়া যেত। হাতি ধরে আনা হতো হিমালয়ের তরাই লঞ্চলের বন থেকে। একেকটি হাতির দাম ছিল ২০০ টাকা করে। কেবল ধনবান ব্যক্তিরাই এই মেলা থেকে হাতি কিনতেন। রাজশাহীর অনেক জমিদার হাতি কিনতেন দরওয়ানির মেলা থেকে। রাজশাহীর অনেক জমিদারেরই হাতি ছিল। হাতি সে সময় হয়ে উঠেছিল একটা সম্মান-প্রতীক বা স্টাটাস সিম্বল। হাতিওয়ালা জমিদারের ছিল একটা ভিন্ন ধরনের মর্যাদা। তবে এসব জমিদারের অনেকেই ছিলেন যথেষ্ট অত্যাচারী। তারা তাদের প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা ছাড়াও নিতেন আবওয়াব ও নজরানা। রাজশাহীর বিখ্যাত কবি রজনীকান্ত তার জমিদার কবিতায় লিখেছেন :

করে প্রজার রক্ত শোষণ
করি মোসাহেবের দল পোষণ;
আর প্রজার বিচার আমলারা করে,
কোথায় আপীল মোশন?
করি হাতিতে চড়িয়া ভিক্ষে,
কেহ না দিলে পায় সে শিক্ষে,
তারা ভিক্ষে-খরচা দিতে জমি ছেড়ে
উঠেছে অন্তরীক্ষে।

আমি জন্মেছি ও বেড়ে উঠেছি রাজশাহী শহরে। আমি বুনোহাতি দেখিনি। তবে পোষা হাতি দেখেছি। আর এর সবই ছিল জমিদারদের হাতি। সব পোষা হাতি হলো বন থেকে ধরে আনা; কিন্তু তাদের অল্প সময়ের মধ্যেই পোষ মানানো যেত। জমিদারি প্রথা এখন আর নেই। সেটা অতীতের স্মৃতি। এখন গড়ে উঠছে ব্যবসায়ী শ্রেণী। যারা টাকা হলেই আর হাতি কেনার কথা ভাবছেন না, কিনছেন মোটর গাড়ি। মোটর গাড়ির সাথে প্রতিযোগিতায় হাতির হেরে যাবারই কথা। হাতি কি জীবন সংগ্রামে বিলুপ্ত হয়েই যাবে? যেমন অতীতে বিলুপ্ত হয়ে গেছে অনেক প্রাণী! আমার মনে হয় হাতি একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যাবে না। তারা বেঁচে থাকবে বিশ্বের নানা চিড়িয়াখানায় এবং সার্কাসের দলে। হাতির খেলা দেখতে আমরা সবাই এখনো ভালোবাসি। একসময় আমাদের দেশের সর্বত্র বনে বুনোমহিষ ছিল; কিন্তু এখন আর বন্য মহিষ নেই; কিন্তু মহিষ বেঁচে আছে গৃহপালিত প্রাণী হিসেবে। মহিষ বিলুপ্ত হয়ে যায়নি।

রবীন্দ্রনাথ তার ‘চৈতলি’ কাব্যগ্রন্থের ‘সভ্যতার প্রতি’ নামক কবিতায় বলেছেন :

দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর,
লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর
হে নবসভ্যতা।

রবীন্দ্রনাথ আরো লিখেছেন : ‘নির্জন অরণ্যের সুগভীর কেন্দ্রস্থলে একটা সুনিবিড় সম্মোহন আছে যেখানে চলছে তার বুড়ো বুড়ো গাছপালার কানে কানে চক্রান্ত, যেখানে ভিতরে ভিতরে উচ্ছ্বসিত হচ্ছে সৃষ্টির আদিম প্রাণের মন্ত্রগুঞ্জরণ। দিনে দুপুরে ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠে তার সুর উদাত্ত পর্দায়, রাতে দুপুরে তার মন্ত্রগম্ভীর ধ্বনি স্পন্দিত হতে থাকে জীবচেতনায়, বুদ্ধিকে দেয় আবিষ্ট করে। (তিনসঙ্গী, পরি :। ছোটগল্প, শেষকথা)’

রবীন্দ্রনাথ সভ্যতার বিরোধিতা করেছেন। বন সম্পর্কে তিনি যা বলেছেন তা কেবলই কবি কল্পনা মাত্র। বনবাসী মানুষ শহরবাসী মানুষের তুলনায় বাঁচে কম দিন। সভ্যতা মানুষকে দীর্ঘায়ু করেছে। করেছে এটাই ইতিহাসের সাক্ষ্য। আমরা আর কোনোভাবেই আদিম আরণ্যক জীবনে ফিরে যেতে পারি না; কিন্তু আমাদের দেশে রবীন্দ্রবাদীরা যেন এরকম কিছু করার কথাই ভাবছেন। তবে তারা এটা ভাবছেন আরাম কেদারায় বসে। হতে চাচ্ছেন না আসলে বনবাসী। আমাদের দেশে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষভাবে প্রচার করছে বন্যাপ্রাণী সংরক্ষণের কথা; কিন্তু ওই বিশ্ববিদ্যালয় যে স্থানে অবস্থিত, সেখানে একদিন বিচরণ করত বন্যহাতির দল। জানি না ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ সেখানে আগের মতো বন্যহাতির পদচারণা সমর্থন করবেন কি না?

পত্রিকার খবরে প্রকাশ (প্রথম আলো : ১২ আগস্ট ২০১৬) আমাদের দেশে এখন প্রায় ২০০ বুনোহাতি বাস করে। এরা বাস করে মূলত চট্টগ্রাম বিভাগের ঘন বনে। এ ছাড়া প্রতি বছর গড়পড়তা প্রায় এক শ’ হাতি বাংলাদেশে আসা যাওয়া করে উত্তর-পূর্ব ভারত ও মিয়ানমার থেকে। ভারত থেকে বুনোহাতি আসা কোনো আশ্চার্যজনক ঘটনা নয়; কিন্তু ভারতের আসাম থেকে বানের পানিতে ভেসে আসা একটি বুনোহাতিকে নিয়ে পত্রিকা ও বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে করা হলো খুবই শোরগোল। হাতিটির নাম দেয়া হয়েছিল বঙ্গবাহাদুর। কেন কী কারণে এই নামটি দেয়া হয়েছিল, আমরা তা জানি না। শুনলাম তার মৃত্যুতে কিছু মানুষ শোক প্রকাশও নাকি করেছেন। জানি না ভারতের হাতি নিয়ে কেন আমাদের এই মায়াকান্না। এর মূলেও কি কাজ করছে কোনো রাজনীতি? পাকিস্তানে কোনো বুনোহাতি নেই। আর থাকলেও তারা এ দেশে ভারত পেরিয়ে আসার ক্ষমতা রাখে না।

হিমালয়ের পাদদেশে শিবালিক পাহাড়শ্রেণী অবস্থিত। অতীতের জীবের যেসব অবশিষ্টাংশ বা চিহ্ন পাথরের মধ্যে রক্ষিত থাকে, বাংলায় তাদের বলে জীবাশ্ম। জীবাশ্ম সম্বন্ধীয় বিজ্ঞানকে বলে পুরাজীববিদ্যা। পুরাজীববিদ্যার গবেষকেরা ভারতের সিমলা শহরের নিকটবর্তী শিবালিক পাহাড়ের মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন অতি প্রাচীন হস্তির জীবাশ্ম। যে ধরনের হাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে প্রায় ১০০০০০০ বছর আগের। বিজ্ঞানীরা মনে করেন এ ধরনের হাতির ক্রমপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে উদ্ভব হতে পেরেছে বর্তমানে বিচরণশীল হাতিদের। তারা এই বিলুপ্ত হাতিদের নাম দিয়েছেন Stegodom ganesa । এই হাতির নাম রাখা হয়েছে হিন্দু দেবতা গণেশের নাম অনুসারে। হিন্দু দেবতা গণেশের মস্তক হলো হাতির মতো; কিন্তু দেহ হলো মানুষের মতো। কেন হিন্দু দেবতা গণেশের নামে এই হাতির নামকরণ করা হয়েছে, আমরা তা জানি না। তবে কলকাতায় অবস্থিত ভারতীয় জাদুঘরে এই হাতির জীবাশ্ম খুব যতœসহকারে সজ্জিত করে রাখা আছে, যা থেকে হস্তি বিবর্তনের একটি ধারণা অনেক সহজেই করা যেতে পারে। অতীতের অনেক প্রাণী এখন আর বেঁচে নেই, বিলুপ্ত হয়ে গেছে। শিবালিক পাহাড়ের পাথরের মধ্যে জিরাফের মতো প্রাণীর জীবাশ্ম পাওয়া গেছে; কিন্তু জিরাফ এখন দক্ষিণ এশিয়ার কোথাও দেখা যায় না। আফ্রিকা মহাদেশের কিছু অংশে দেখা যায়।

আমাদের দেশের অনেক বুদ্ধিজীবী চিন্তিত হয়ে উঠেছেন বন্যপ্রাণীদের নিয়ে। তারা বলছেন, অনেক বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হতে পারে। এদের সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে; কিন্তু অবস্থার সাথে খাপ খাওয়াতে না পারলে প্রাণীরা বিলুপ্ত হবেই। এটাই প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম। জীবজগতের বিবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখি যে, অতীতের বহু প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে; কিন্তু আবার তার স্থলে আবির্ভাব ঘটেছে নতুন প্রাণীদের। বিলুপ্তি যেমন সত্য, নতুন প্রাণীর আবির্ভাবও তেমনি একইভাবে সত্য।

দৈনিক নয়াদিগন্ত, ২১ আগস্ট ২০১৬।

Like this article?

Leave a comment

জনপ্রিয় লেখাসমূহ

জনপ্রিয় বিভাগসমূহ